“চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করতে  দলীয় ক্যাডারের হুমকির মুখোমুখি অসহায় এলাকাবাসী”


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১, ২০২২, ৭:৪৪ অপরাহ্ন / ২৪৬
“চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করতে  দলীয় ক্যাডারের হুমকির মুখোমুখি অসহায় এলাকাবাসী”

“বাঁশখালীতে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করতে  দলীয় ক্যাডারের হুমকির মুখোমুখি অসহায় এলাকাবাসী”
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের বাঁশখালী পৌরসভার জঙ্গল জলদী আমিরাঘোনা এলাকায় নির্বিচারে বসতঘর ভেঙে, সহস্রাধিক গাছ কেটে তান্ডব চালিয়ে দলীয় ক্যাডারদের জায়গা দখলের ঘটনায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এনিয়ে গতকাল দৈনিক চট্টগ্রাম মঞ্চ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় ক্যাডারদের দখলবাজি ও তান্ডব চালানোর এই কাজে প্রশাসন গরীব ভূমিহীনদের পক্ষ না নিয়ে দলীয় ক্যাডারদের সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। গত ২০ নভেম্বর থেকে এখানে দফায় দফায় তান্ডব চালানোর পর ভুক্তভোগী লোকজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার ভূমি, পৌরসভার মেয়র ও বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বরাবরে আবেদন নিবেদন করেও কাজ হয়নি। বরং সব জায়গা থেকে তাদের সরকারী খাস জায়গা বলে তাড়িয়ে দেয়া হয়। অথচ এই খাস জায়গায় লিজ নিয়ে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে ভূমিহীন লোকজন সেখানে বসবাস করে আসছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, প্রথমে এই জায়গা যুবলীগ নেতা সাঈদের নেতৃত্বে জবর দখলের জন্য অপচেষ্টা করা হয়। সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দলীয় ক্যাডারদের একটি সিন্ডিকেট এখন প্রশাসনকে ব্যবহার করে ওই জায়গা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দিন দুপুরে প্রশাসনের সামনে চালানো তান্ডব ও সহস্রাধিক গাছ কেটে ফেলার ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রশাসন এখন ঘর দেয়ার কথা প্রচার করছেন। গরীব লোকজনকে সরকারী ঘর বরাদ্দ দিলে কখনো তাদের গাছগাছালি কেটে বসতঘর ভেঙে তান্ডব চালানোর কথা নয়।
স্থানীয় ফরিদা আকতার বলেন, আমি একজন বিধবা। ৭০ বছর ধরে আমরা এই জায়গায় বসবাস করি। জায়গাটি আমাদের নামে লিজ আছে। খাজনাও পরিশোধ করেছি আমরা। জলদী এলাকা পৌরসভা হয়ে গেলে বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের উচ্ছেদ করতে দলীয় ক্যাডাররা হুমকি দিচ্ছে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১০টির অধিক ঘরবাড়ি। গুঁড়িয়ে দেয়া স্থাপনার মধ্যে একটি নুরানী মাদরাসাও রয়েছে। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় হতবাক সচেতন মহল। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় ভূমিদস্যু সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের যোগসাজশে খেটে খাওয়া মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে এমন তান্ডবলীলায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাছাড়া ভূমিহীন লোকজনকে উচ্ছেদ করার সময় কোন ধরণের আইন আদালত মানা হয়নি। বাঁশখালী আদালতে ফরিদা বেগমের পক্ষে মামলা থাকলেও ওই মামলা তোয়াক্কা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন। গত ২০ নভেম্বর রবিবার থেকে দফায় দফায় চালানো হয়েছে এই তান্ডবলীলা। এখনো চলছে বৃক্ষ নিধন ও ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার মহোৎসব। এতে অংশ নিয়েছেন খোদ উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সার্ভেয়ার গোলাম মাওলাসহ কয়েকশত বহিরাগত ব্যক্তি ও ভূমিদস্যু।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় যুবলীগ নেতা সাঈদসহ একটি সিন্ডিকেটকে জায়গা পাইয়ে দিতেই প্রশাসনের নেতৃত্বে এই উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাসীদের ভয়ে চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে এলাকার বাসিন্দারা।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুবলীগ নেতা মো. সাঈদ সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রশাসনের লোকজন লেবার নিয়ে গেছে উচ্ছেদ করার জন্য। আমি উচ্ছেদ করার জন্য যাইনি। সেদিন সাংবাদিক ও পুলিশ ছিল ঘটনাস্থলে। ওখানে তো আমার কিছু নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদা আক্তার বলেন, ‘সরকারী খাস জায়গা লিজ নিয়ে দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশী সময় ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছি। বর্তমানে সেখানে কয়েক শত বসতবাড়ি রয়েছে। বাঁশখালীর বড়ঘোনা, গন্ডামারা, সরলসহ বিভিন্ন এলাকার গরীব লোকজন কম মুল্যে জায়গা কিনে পৌরসভার পাহাড়ি ওই এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু জায়গা জমির মুল্য বেড়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ ওই জায়গার উপর ভূমিদস্যুদের কু-নজর পড়ে। তারা এর আগেও কয়েক একর এরিয়ার বিশাল এই জায়গা দখলে নিয়ে নানা অপতৎরতা চালায়। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেয়ার নামে ওই জায়গা দখলে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে গরীব লোকজনকে প্রথমে হুমকি ধমকি পরে প্রশাসনকে হাত করে তাদের উচ্ছেদ করেন।’
গত ২০ নভেম্বর থেকে এখানে দফায় দফায় তান্ডব চালিয়ে ১০টি ঘর ভাংচুর এবং বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বৃক্ষ কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী লোকজন পৌরসভার মেয়র এ্যাডভোকেট তোফাইল বিন হোসাইন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর শরনাপন্ন হয়েও তাদের বাড়িঘর রক্ষা করতে পারেনি বলেন জানান ফরিদা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে কেটে ফেলা গাছের শিকড় ও গোড়ালি বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলা হচ্ছে। লোকজনকে সরে যেতে হুমকি দেয়া হচ্ছে। নুরুল আলম নামে এক ব্যক্তি সেখানে জায়গার দখল বুঝে নিতে মহড়া দিয়েছে। জায়গা পাইয়ে দেয়ার নামে নুরুল আলমের কাছ থেকে যুবলীগ নেতা সাঈদ ৪ লাখ টাকা নিয়েছে বলেও শুনা যাচ্ছে। তাছাড়া গতকাল ভূমিহীনদের ওই জায়গায় সরকারী উপহার ঘর নির্মাণ প্রকল্পের জায়গা বলে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বর্তমানে নতুন করে বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেয়ার এই প্রকল্প আসেনি বলে জানা গেছে। সরকার উপহারের ঘর দিলে আরেকজন ভূমিহীনকে উচ্ছেদ করে ঘর বাড়ি ভেঙে কিংবা গাছপালা কেটে তান্ডব চালিয়ে কোন ধরণের উপহার দেবে সেটাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রশ্ন। তাছাড়া বর্তমানে উচ্ছেদ করা বসতবাড়িতে অন্ধ, প্রতিবন্ধি ও পঙ্গু মানুষও রয়েছে। রয়েছে একজন সংবাদকর্মীও।
বাঁশখালীতে প্রশাসনের সহায়তায় এমন তান্ডবের ঘটনায় সর্বত্রে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর প্রদান নিয়েও। সরকারের গরীব জনগনের জন্য এই প্রকল্প চালু করলেও বাঁশখালীতে গরীব মেরে বড় লোকদের জায়গা দখল করার এই ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এবিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, ‘ওখানে ৪ থেকে ৫টি অবৈধ বসতি ছিল। এরমধ্যে ২টি ছিল জুয়ার ঘর। এগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর যে ৫-৭ জনকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ; তাদেরকে সরকারি ঘর দেওয়া হবে। এটা তো মুজিববর্ষের প্রকল্প। এটা কি আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকল্প? আমরা কেন জায়গা দখল করবো আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে দেওয়ার জন্য? আমরা তো ওখানে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছি। ওখানে ৫০টি ঘর নির্মাণের জন্য একাউন্টে টাকাও চলে আসছে। ওখানে বসবাসকারীরা এখন টিনের ঘরে রয়েছে। আমরা বলেছি তাদেরকে পাঁকা ঘর দেব। আর যে নুরানি মাদরাসা ও এবাদতখানা রয়েছে ;সেগুলো আগে মুরগীর খামার ছিল। দখল করার জন্য খামারটি নুরানি মাদরাসায় রুপান্তর করছে’।