খুনি এরশাদ শিকদারের বিলাসবহুল ‘স্বর্ণকমল’ ভেঙে ফেলা হচ্ছে ।


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৮, ২০২৩, ৮:৪৮ অপরাহ্ন / ৪৬১
খুনি এরশাদ শিকদারের বিলাসবহুল ‘স্বর্ণকমল’ ভেঙে ফেলা হচ্ছে ।
খুনি এরশাদ শিকদারের বিলাসবহুল ‘স্বর্ণকমল’ ভেঙে ফেলা হচ্ছে ।
মোঃ শামীম হোসেন- খুলনা –
আমি তো মরে যাবো, রেখে যাবো স্মৃতি/ আছিসনি কেউ সঙ্গী-সাথি/ সঙ্গে আমার যাবি’—আলোচিত এই গানটি যে ভবনে বসে গেয়েছিলেন খুলনার কুখ্যাত খুনি এরশাদ শিকদার, ‘স্বর্ণকমল’ নামের বিলাসবহুল সেই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। জমির মালিকরা সেখানে বহুতল ভবন করবেন। এ কারণেই গত কয়েক দিন ধরে ভব্নটি ভাঙার কাজ চলছে।
ভবন ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক আজিজুল, রহমানসহ অন্যরা জানান, স্বর্ণকমলের অর্ধেক ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এরশাদ শিকদারে এক ছেলে ওই অংশের জমি বিক্রি করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকার মজিদ সরণিতে আলোচিত এই বাড়িটি নির্মাণের জন্য সেসময় বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল সবধরনের সামগ্রী। নকশা হেরফের হওয়ার কারণে জীবন দিতে হয়েছিল রাজমিস্ত্রির। ২০০৪ সালের ১০ মে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এরশাদ শিকদার অধ্যায়। কিন্তু বিলাসবহুল ‘স্বর্ণকমল’ ঘিরে ছিল নানা রহস্য। নির্মিত হওয়ার পর দূর থেকেই দোতলা ভবনটি দেখেছে মানুষ। ভনবটির প্রবেশদ্বারে সোনালি প্লেটের ওপর লেখা ছিল ‘স্বর্ণকমল’। কথিত আছে, বাড়িটি বানানোর সময় এরশাদ শিকদারের হাতে খুন হন নির্মাতা। বাড়ি নির্মাণের গোপন বিষয়গুলো যাতে কেউ জানতে না পারেন সেজন্য তাকে হত্যা করা হয়। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, এ বাড়িটি নির্মাণের সময় কিছু অংশ অন্যের জমিতে ঢুকে যাওয়ায় নির্মাতাকে খুন করেন এরশাদ শিকদার। এরশাদ শিকদার যখন জীবিত ছিলেন তখন অবৈধ উপায়ে শত কোটি টাকা অর্জন করেছিলেন। বাড়িটিতে বসতো জলসা। সেই জলসায় অংশ নিতেন খুলনার রথি-মহারথিরা।
এরশাদ শিকদারের মৃত্যুর পরও কিছুদিন নামফলকটি থাকলেও পরে তা খুলে ফেলা হয়। এরপর আর কোনো নাম দেওয়া হয়নি ভবনটির। কিন্তু সম্প্রতি ভবনের একাংশ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এরশাদ শিকদারের ছেলেরা। সেই সিদ্ধান্তের পর বাড়িটির ভেতরে ভাঙার কাজ শুরু হয়। অবশ্য এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি বাড়িতে অবস্থান নেওয়া স্বজনরা। এরশাদ শিকদারের জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার বাবা ছিলেন বন্দে আলী শিকদার। ৮ ভাইবোনের মধ্যে এরশাদ শিকদার ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৬৭ সালে জন্মস্থান নলছিটি ছেড়ে খুলনায় চলে যান। ঘাঁটি গাড়েন ৫ নম্বর ঘাট এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দূরন্ত আর প্রচণ্ড সাহসী ছিলেন এরশাদ শিকদার। ১২ বছর বয়সে ৭০-৮০ কেজি ওজনের চাল, গমের বস্তা নিয়ে কার্গো থেকে লাফিয়ে ভৈরব নদ পেরিয়ে যেতেন অনায়াসে। ফলে তার নাম হয়ে যায় ‘রাঙ্গা চোরা’। একপর্যায়ে খুলনা রেলস্টেশনে নেন কুলিগিরির কাজ। এরপরই জড়িয়ে পড়েন নানা দুর্নীতির কাজে। সেই সময়ে যারা তার সঙ্গে ছিলেন তাদের নিয়ে গঠন করেন একাধিক দল। এর মধ্যে ছিল শিক্ষিত আর অশিক্ষিত বাহিনী। একটি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল জামাই ফারুকের হাতে। অপর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল ল ম লিয়াকত লষ্করের হাতে। আর তার নিজের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন নুরে আলম। মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই ১৯৭৬ সালে এরশাদ শিকদার ‘রামদা বাহিনী’ নামে একটি দল গঠন করেন। যারা খুলনা রেলস্টেশন ও ৪ নম্বর ঘাট এলাকায় চুরি-ডাকাতি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এই রামদা বাহিনী নিয়েই এরশাদ শিকদার ১৯৮২ সালে ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা দখল করেন এবং একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। জাতীয় পার্টির (জাপা) রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচন করেন এরশাদ শিকদার। জয়ী হন বিপুল ভোটে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘাট এলাকায় এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা করেননি কুখ্যাত এই খুনি। খুলনার রেলওয়ের সম্পত্তি এবং জোরপূর্বক ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল, মাদক ব্যবসা, নারী অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এরশাদ শিকদার। ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন তার বডিগার্ড নুরে আলম। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনার জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এরশাদ শিকদারের।