“ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর”


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৩, ২০২২, ৯:০১ অপরাহ্ন / ৫১৮
“ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর”

“ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর”
মোঃ ইব্রাহিম শেখ চট্টগ্রাম ব্যুরো:

দুর্গম পাহাড়ের আনাচে-কানাচেও এখন মসৃণ সড়ক-মহাসড়ক। ঝরনার ছড়া কিংবা
ছোট-বড়নদীর ওপরে তৈরি হয়েছে শত শত ব্রিজ-কালভার্ট। এক সময়ের সাত দিনের পাহাড়ি হাঁটাপথে এখন যানবাহনে
চলা যায় মাত্র দুই ঘণ্টায়। উঁচু পাহাড়েও ঝলমল করে বিদ্যুতের আলো। প্রায় সবখানেই মিলছে মোবাইল ফোনের
নেটওয়ার্ক।
দুর্গম উঁচু পাহাড়েও ব্যবস্থা করা হচ্ছে সুপেয় পানির। এক সময়ের বিচ্ছিন্ন পাড়াগুলোতেও বসেছে জমজমাট বাজার। পর্যটন
স্পটগুলোও এখন সরগরম। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুর্গম এলাকার শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষদের জন্য চার হাজার
৮০০ ‘পাড়াকেন্দ্রে’ পরিচালিত হচ্ছে সচেতনতামূলক কার্যক্রম। বলতে গেলে এখন কি নেই পাহাড়ে। সমতলের সঙ্গে তাল
মিলিয়ে দুর্গম পাহাড়েও হয়েছে বৈপ্লবিক উন্নয়ন। যা এখন সবার নজর কাড়ে।
গত ২৬-২৯ নভেম্বর পর্যন্ত পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িসহ আশপাশের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা ঘুরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের
এমনই চিত্র দেখা গেছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছরে এসে উন্নয়ন-অবকাঠামোয় অনেকটাই বদলে গেছে পাহাড়িদের
জীবনমান। আজ (২ ডিসেম্বর) সেই ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি হলো। সরেজমিন পার্বত্য অঞ্চল
পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, পার্বত্য চুক্তির পর গত ২৫ বছরে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়
পার্বত্য অঞ্চলে সার্বিকভাবেই হয়েছে অনন্য উন্নয়ন। তবে এই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারের ক্ষেত্রে
এখনও প্রধান বাধা হয়ে আছে পার্বত্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। পাহাড়কে আতঙ্কের জনপদ করে রাখতে এখনও
ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। শান্তি চুক্তির সময়ের একমাত্র ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ (জেএসএস) থেকে
এখন জন্ম নিয়েছে অন্তত ছয়টি সশস্ত্র সংগঠন।
পাহাড়ে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি, অপহরণ ও হামলাসহ নানা সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে
যাচ্ছে তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ নভেম্বর বিকালে পাকা সড়কপথে গাড়িযোগে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ঘাসবন এলাকায় দুর্গম চন্দ্রকুমার
পাড়ায় কথা হয় স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য মধুসুদন ত্রিপুরার সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকাটি ত্রিপুরা অধ্যুষিত। আমাদের
এখানে ২৯টি পাড়া আছে। আগে মাটি এবং ইটের তৈরি সরু রাস্তা ছিল। এখন জেলা শহর থেকে প্রশস্ত পাকা সড়ক তৈরি
হয়েছে। এখানে প্রায় সব ঘরেই রয়েছে বিদ্যুৎ।ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগসহ অনেক সুবিধা রয়েছে এখন। পাহাড়ে এখন
সাজানো-গোছানো ঘরবাড়িওহচ্ছে।
আশপাশে ছোট-বড় বাজার আছে। কাছাকাছি অবস্থানেই চারটি স্কুল আছে। এ ছাড়া শহরে (খাগড়াছড়ি) যেতেও
গাড়িযোগে এক ঘণ্টার বেশি লাগে না। যা আগে হেঁটে গেলে সারা দিন লাগত। তারপর আবার পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের
আনাগোনাও ছিল বেশি। ১৯৮৪ সালে ঘাসবন এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপিত হলে তারপর থেকে এই এলাকায়
অন্তত সন্ত্রাসীদের উৎপাত তেমন নেই বললেই চলে।’
একই এলাকায় কথা হয় ভাড়ায় বাইক চালানো খোকা রঞ্জন ত্রিপুরা বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই দুর্গম
এলাকায় যেসব সুবিধা পাচ্ছি তা কখনো চিন্তাও করিনি।’
কথা হয় ধবল মনি ‘কারবারি’র ছেলে চন্দন মৈ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের পাড়ার আশপাশে রয়েছে অনেক বাঙালি পাড়া।
আমার অনেক বাঙালি বন্ধু আছে। আমরা একে অন্যের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ। এখানে আমরা সবাই মিলে ভালো আছি।

গত ২৯ নভেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের কাঁচা বাজারের সামনে সড়কে অন্যদের মতো সবুজ রঙের মাল্টার ডালা নিয়ে
বসেছিলেন জোলেখা চাকমা (৪০)। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি খাগড়াছড়ির কুকিছড়ায়। গ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ের বাগান
থেকে মাল্টা কিনে শহরে এনে বিক্রি করি। আগে যেখানে শহরে আসতে পুরো এক দিন লাগত, সেখানে এখন গাড়িযোগে মাত্র
এক ঘণ্টায় চলে আসি। বেচাকেনা শেষে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। দুই ছেলেমেয়েকে
লেখাপড়া করাতে পারছি, এটাই ভালো লাগে।’
পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের মধ্যে কথা হয় দুর্গম দীঘিনালার কোবাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলামের
সঙ্গে। পেশায় ভাড়ায় বাইক চালান। তিনি বলেন, ‘পাড়া-মহল্লার সরু পথগুলোও ইটের তৈরি বা পাকা হয়েছে। উন্নয়নে
অনেক এগিয়ে গেছে এ এলাকা।’
এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য (এমপি) কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা বলেন, ‘১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর
যখনই উন্নয়নের সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল তখনই পাহাড়ে ফের অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়। এখানে কিছু ব্যক্তি বিশেষ
যেমন সন্তু লারমা ব্যক্তিগত স্বার্থে পাহাড়কে মাঝেমধ্যে অশান্ত করেন।’
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের যে উন্নয়নের মহোৎসব চলছে
তার একটি উদাহরণ হলো, চলতি বছরে এক দিনেই পার্বত্য এলাকায় ৪২টি ব্রিজ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রতিটি উপজেলায় সরকারি স্কুল-কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজসহ নানা ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে। যা সম্ভব হয়েছে শান্তি চুক্তির
কারণেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক প্রচেষ্টায় শান্তি চুক্তি এবং উন্নয়ন ধারাবাহিকতা এখন সবার সামনে দৃশ্যমান।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এখানে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সশস্ত্র গ্রুপ দিয়ে শান্তির পাহাড়ে রক্ত ঝরিয়ে যাচ্ছে।’
খাগড়াছড়ির চরপাড়ার ‘মডেল পাড়াকেন্দ্র’-এ দেখা যায় বেশ কয়েকজন শিশু ও কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে নানা
শিক্ষণীয় কার্যক্রম চালাতে। এ সময় পাড়াকেন্দ্রের ফিল্ড অর্গানাইজার কনিকা রোয়াজা (ত্রিপুরা)বলেন, ‘আমার আওতায় এ
রকম ১৩টি পাড়াকেন্দ্র আছে। যেখানে শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, নৃত্য, গান, চিত্রাঙ্কনসহ নানা বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া
হয়। যদিও এই এলাকাটি ত্রিপুরা অধ্যুষিত কিন্তু এসব পাড়াকেন্দ্র পাহাড়ি-বাঙালি সবার জন্যই।’
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘কয়েক দিন আগে সড়ক বিভাগের ১০০টি ব্রিজ বা সেতু এক
দিনেই উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার মধ্যে ৪২টি এই পার্বত্য এলাকায়। শান্তি চুক্তি না হলে এ ধরনের
উন্নয়ন হতো না। এখানে পর্যটন ও কৃষি অর্থনীতি বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। সাজেকসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকদের
আনাগোনা ব্যাপক হারে বাড়ছে।’
সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পার্বত্য চুক্তির আগ পর্যন্ত (১৯৯৭ সাল) পার্বত্য চট্টগ্রামের সড়ক
যোগাযোগ বা রাস্তা ছিল দুই হাজার ৮০৩ কিলোমিটার। এরপর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তির পর পাঁচ হাজার ১৪৬
কিলোমিটার রাস্তা নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তা হয়েছে মোট সাত হাজার ৯৪৯ কিলোমিটার। এ ছাড়া
বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ও অন্যান্য ক্লিনিকসহ এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা
২৭০টি। শান্তি চুক্তির আগ পর্যন্ত যা ছিল মাত্র ২৪টি। চুক্তির আগে কলকারখানা (ক্ষুদ্র-কলকারখানাসহ) ছিল ১৩৫টি এবং
বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৩টি। এ ছাড়াও বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন
সম্প্রদায়ের জন্য উপাসনায়লগুলোর মধ্যে মন্দির নির্মিত হয়েছে মোট ৪৪৬টি, কিয়াং এক হাজার ৬৬০টি এবং গির্জা
রয়েছে ৭১৪টি। যার বেশিরভাগই পার্বত্য চুক্তির পর নির্মিত হয়েছে।
এ ছাড়া গত সাত বছরেই শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ হয়েছে ৫৯১টি। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা এক হাজার ৬৮৬টি এবং বেসরকারি ৩৭৮টি। হাই স্কুল সরকারি ৩১৮টি এবং বেসরকারি
২৮২টি। কলেজ সরকারি ২৪টি এবং বেসরকারি ২৬টি। মাদরাসা, পলিটেকনিক, নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ এ রকম আরও

অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পার্বত্য অঞ্চলে। এ ছাড়াও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে ১৬৯টি। এর বাইরেও
পার্বত্য এই তিন জেলার দুর্গম এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণাধীন রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি ২৫ বছর পূর্তি : সরকারি তথ্য মতে, বর্তমান সরকার গত ২৫ বছরে শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার
মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন করেছে। চুক্তির অবশিষ্ট ১৫টি ধারা আংশিক এবং ৯টি ধারা
বর্তমানে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পার্বত্য সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পরেও থামেনি সংঘাত। এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে সন্তু লারমার অবৈধ
অস্ত্রের মজুদ। শান্তি চুক্তির নামে সন্তু লারমা সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে অস্ত্র
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আখড়া তৈরি করে রেখেছেন দুর্গম পাহাড়ে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি হলে এতে বলা হয়েছিল-সব ধরনের অস্ত্র সরকারের কাছে জমা করার
জন্য। চুক্তি যথাযথভাবে না মেনে কিছু পুরোনো অস্ত্র জমা দিয়ে ভালো অস্ত্রগুলো নিজের কাছে মজুদ রাখে জেএসএস।
বর্তমানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে নতুন নতুন অস্ত্রের আরও মজুদ গড়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।